Wednesday, 18 May 2016

বিশ্বশান্তি

(সংকেত: সূচনা; বিশ্বশান্তি ধারণার জন্ম; বিশ্ব পরিস্থিতির পট পরিবর্তন; বিজ্ঞান ও আধুনিক সমরাস্ত্রের ভয়াবহতা; বিশ্বশান্তির পক্ষে কবি; সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের কলমযুদ্ধ; চলচ্চিত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বিশ্বশান্তি; জাতিসংঘ ও এর আন্দোলন; বৈশ্বিক বাস্তবতা; উপসংহার।)
সূচনাঃ মানুষ সহজাতভাবে শান্তিকামী। শান্তির খোঁজে একদিন যাযাবর মানুষ সভ্যতার গোড়াপত্তন করে। স্থিতিশীলতা ও প্রকৃতির অপার সম্ভাবনায় মানব সভ্যতা ক্রমেই সমৃদ্ধির পথে হাঁটতে শুরু করে। কিন্তু এ সমৃদ্ধি ধীরে ধীরে মানব মন ও সমাজকে জটিল করে তোলে। জন্ম নেয় শ্রেণি সংগ্রাম, দ্বন্দ্ব, লোভ-লালসার। মানুষ সমাজ ও রাষ্ট্র তৈরি করে আর মানব সভ্যতাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত করতে জন্ম দেয় নিয়মনীতি ও ক্ষমতাবান শাসক শ্রেণির। আর সাথে সাথে শুরু হয়ে যায় শোষণ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ধ্বংসের খেলা। এ খেলা এখনও বিদ্যমান। এক বিংশ শতাব্দিতে এসেও আমাদের এর বিভীষিকা ও ক্ষত বয়ে বেড়াতে হয়। কারণ মানব মনের লোভ, প্রতিহিংসা, অজ্ঞতা এ খেলার সৃষ্টি করেছে, যা মানব সভ্যতার অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে। এ সভ্যতার বেদীতল তাই বারবার রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। সংঘর্ষ ও যুদ্ধ বিনাশ করেছে কোটি মানুষের জীবন ও স্বপ্ন। তাই বিশ্বের লাখো কোটি মানুষের মুখে আজ শান্তির বাণী উচ্চারিত হচ্ছে।
বিশ্বশান্তি ধারণার জন্মঃ সৃষ্টির আদিকাল থেকেই মানুষ যুদ্ধ সংঘর্ষে লিপ্ত। প্রাথমিক পর্যায়ে, যুদ্ধ ছিল শুধু অস্তিত্ব বা বেঁচে থাকার লড়াই। পরবর্তীতে যুদ্ধ হতো সীমানা ও সম্পদ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে। পরে রাষ্ট্রভাবনার জন্ম হওয়ার পর রাষ্ট্র দখল ও আধিপত্য বিস্তারের জন্য যুদ্ধ শুরু হয়। বিগত শতকে বিজ্ঞান ও সভ্যতার অভূতপূর্ব উন্নতি, মানুষকে ভয়াবহ ও বিধ্বংসী যুদ্ধের দিকে আরও একধাপ অগ্রসর করে, শুরু হয় মহাযুদ্ধ। মহাযুদ্ধের হিংস্রতা মানুষের ধারণাকে বদলে দেয়। এরপরই ভাবতে হয় বিশ্বশান্তির ভাবনা। সহজ কথায়, বিশ্বযুদ্ধ বিশ্বশান্তি ধারণার জনক।
বিশ্ব পরিস্থিতির পট পরিবর্তনঃ প্রথম মহাযুদ্ধের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন এমন এক সংগঠন তৈরির ধারণা দেন যা দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান করবে। এই প্রথম তখন বৈশ্বিক শান্তির ধারণার উদ্ভব ঘটে। এ লক্ষ্যে লীগ অব নেশনস গঠিত হয়। কিন্তু নানা অব্যবস্থাপনা সমঝোতার অভাবে এটি ভেঙ্গে যায়। এটিই বিশ্বের প্রথম সংগঠন যার মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্বশান্তি স্থাপন করা। লীগ অব নেশনসের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। মহাযুদ্ধকে কেন্দ্র করে সমরাস্ত্রের বিকাশ তথা পারমানবিক শক্তির উদ্ভাবন মানব সভ্যতার ইতিহাসকে বদলে দেয়। ১৯৪৫ সালে আমেরিকা জাপানের হিরোশিমা নাগাসাকি শহরকে পারমানবিক বোমার আঘাতে ধ্বংস করে দেয়। এ অস্ত্রের ভয়াল আক্রমনের প্রমান আজও শহর দুটো এবং শহরের মানুষ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে বেড়াচ্ছে। এ হামলা প্রমান করে আমাদের মানবসভ্যতার সংকট কতোটা ভয়ঙ্কর। মানুষ আজ নিজেদের হিংস্রতায় নিজেরাই বিমূঢ়। তাই, বিশ্বযুদ্ধের পর  স্নায়ু যুদ্ধের সময়ে পারমানবিক অস্ত্রের বিকাশ ঘটলেও এর ভয়াবহতার কথা চিন্তা করে প্রয়োগ হয়নি। যদিও এখন মানুষের এ ধ্বংসের ক্ষমতা বহুগুনে বেড়েছে, বিশ্ব শক্তিগুলো আরও শক্তিশালী হয়েছে, তবুও এ অস্ত্রের প্রয়োগ এখনও হয়নি। যেকোনো সময়ে প্রতিহিংসার মূল্য মানব সভ্যতাকে দিতে হতে পারে। বিশ্ব নাগরিকরা তাই আজ সচেতন। তাদের আন্দোলন, প্রতিবাদ বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার দাবিকে আরও সুগঠিত করেছে। কোনো রাজ্য জয় নয়, কোনো ক্ষমতার আধিপত্য নয়, তারা চায় বিশ্বশান্তি। তাদের এ চিন্তাধারা বিশ্ব রাজনীতির রচিত পথ পাল্টে দিয়েছে। রাষ্ট্রনায়কেরা আজ নতুনভাবে বিশ্বশান্তির গুরুত্ব দিচ্ছেন।
বিজ্ঞান ও আধুনিক সমারাস্ত্রের ভয়াবহতাঃ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার মানব সভ্যতাকে এক দিক থেকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কাগজে-কলমে ভয়ানক সমারাস্ত্রের বিরোধী, কিন্তু বাস্তবে এর ভয়াবহতার শিকার হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের দূর্বল রাষ্ট্রগুলো। পারমানবিক শক্তির অধিকার বলে অনেক বড় রাষ্ট্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের উপর আধিপত্য বিস্তার করেছে। বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে বৈদেশিক নীতি ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে, সামরিক খাতে দেশগুলোর ব্যয়বরাদ্দ বাড়াচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্স, জাপান, ভারত এ খাতে অর্থ ব্যয় করেছে। দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, সাবমেরিন, আনবিক যুদ্ধ জাহাজ বানাচ্ছে, নক্ষত্র যুদ্ধের ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে মার্কিন মুলুকে। যুদ্ধ গ্রহে-উপগ্রহে, মহাকাশে বিস্তার লাভ করেছে। লেজার রশ্মি দিয়ে শত্রুর উপগ্রহ কিভাবে ধ্বংস করা যায়, তা নিয়ে গবেষণা করছে সমরবিদরা। এসব মারনাস্ত্র চালাতে যে শক্তি ও জ্বালানি দরকার তা সংগ্রহের জন্য বিশ্ব অবলোপন করছে আরও সংঘাত। ২০০৩ সালে তেলের জন্য আমেরিকার ইরাক আক্রমন, লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ, শিশুর মৃত্যুর কারণ। যেখানে গোটা বিশ্ব আজ ক্ষুধা, দারিদ্র্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত, সেখানে বিশ্ব শক্তিগুলো তান্ডব চালাচ্ছে যা শুধু মাত্র তুচ্ছ স্বার্থ ও ক্ষমতার জন্য। এর ফলে ঝরে যাচ্ছে হাজারো নিষ্পাপ প্রাণ।
বিশ্বশান্তির পক্ষে কবি-সাহিত্যিকদের কলম যুদ্ধঃ শিল্প, সাহিত্যকে সমাজের র্দপন বলা হয়। কবি-সাহিত্যিকরা তাদের লেখনীর মাধ্যমে সমাজের রূপ ও ইতিহাসকে তুলে ধরেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমরা আমাদের সভ্যতাকে তাদের লেখনীর মাধ্যমেই চিনি। যুদ্ধের ভয়াবহতা, বিশ্বশান্তি বার্তা আমরা তাদের সৃষ্টিকর্মের মাঝে খুঁেজ পাই। পাবলো পিকাসোর শ্বেত শুভ্র পারাবত আজ দেশে দেশে হাজারে হাজারে নীল গগণে ডানা মেলে উড়ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমলেই শান্তির দাবি সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল। গঠিত হয়েছিল “যুদ্ধ ও ফ্যাসিবিরোধী সংঘ”। অনেক চিত্রকর্ম ও সাহিত্য রচনা হয়েছে বিশ্বশান্তির বানী প্রচারের জন্য।
চলচ্চিত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বিশ্বশান্তিঃ বিশ্বশান্তি কথাটিকে বিশ্বব্যাপি জনপ্রিয় করার পেছনে, চলচ্চিত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া অভূতপূর্ব অবদান রেখেছে। এই একবিংশ শতাব্দিতে সংবাদ টিভি গুলো যেমন- আল-জাজিরা, বিবিসি সারাবিশ্বের শান্তি কার্যক্রমের খবর ঢালাওভাবে প্রচার করছে। তাছাড়া নানা মিশনের পক্ষে-বিপক্ষে টকশো ও সেমিনারের আয়োজন করেছে। বিশ্বশান্তি সম্পর্কে রাষ্ট্রনায়কদের মতামত নিচ্ছে। পত্র-পত্রিকা ও অনলাইন মাধ্যমগুলোতে সংবাদ ও তথ্য প্রচারের মাধ্যম বিশ্বশান্তির পক্ষে মিডিয়া চাপ তৈরি করছে। স্ট্যানলি কুবরিক এর দি পাথ অব গ্লোরি, রবার্তো বেনিগনি এর লাইফ ইজ বিউটিফুল সহ অসংখ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে যুদ্ধ ও সংঘর্ষের উপরে। আমাদের বাংলাদেশেও ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের ভয়াবহতা তুলে ধরে “জয়যাত্রা, গেরিলা” সহ নানা চলচ্চিত্র হয়েছে। আর বার বার বিশ্ব নাগরিককে শান্তি আনয়নের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।
জাতিসংঘ ও এর আন্দোলনঃ জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাই হয়েছে বিশ্বশান্তির উদ্দেশ্যে। এর নির্দিষ্ট নীতিমালা ও সুসজ্জিত সামরিক বাহিনী আছে। ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটি বিবাদপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে শান্তি আনয়নের মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। কঙ্গো, সুদানে রিফিউজি সমস্যা সমাধান, বিশ্বসন্ত্রাস নিয়ন্ত্রন, আফগানিস্থান-পাকিস্তান ও অন্যান্য দেশে সামরিক অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব জাতিসংঘের। তাছাড়া বিশ্বশান্তি আনয়নে ক্ষুদ্র দেশগুলো নানা দাবী-দাওয়া জাতিসংঘের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারে। বিশ্ব শক্তিগুলো ব্যপক অনুদানের শক্তি বলে জাতিসংঘ তথা সারাবিশ্বে আধিপত্য বিস্তার করছে। যা বিশ্বশান্তি আনয়নে প্রধান বাধা।
বৈশিক বাস্তবতাঃ আমরা সকলেই বিশ্বশান্তির প্রয়োজনীয়তায় অনুধাবন করি। বিশ্বশান্তি রক্ষার জন্য আমাদের কী কী করনীয় তাও আমরা জানি। কিন্তু এখনও আমরা চিন্তা ও জ্ঞানের জগতে মুক্ত নই, উদার নই। আমাদের অজ্ঞতা ও হীনম্মন্যতা অনেক ক্ষেত্রে আমাদের দাসে পরিণত করে রেখেছে। বিশ্বশান্তির পথে বাধাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
- বিশ্বায়নের অপব্যবহার,
- আন্তর্জাতিক সংঘের অপব্যবহার,    
- ক্ষমতার আগ্রাসন,
- দারিদ্র্য,
- অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা,
- সন্ত্রাস ও বিশ্বব্যপী সামাজিক অস্থিতিশীলতা,
- মরণাস্তের উত্তরোত্তর বিকাশ,
- মানব মনের পঙ্গুত্ব ও দাসত্ব,
- বিশ্বশক্তির আধিপত্য ইত্যাদি।
উপসংহারঃ আমাদের সব বাধা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। যুদ্ধ, সংঘাত মানেই মৃত্যু, উপবাস, দুর্ভিক্ষ। মানুষের তিলে তিলে গড়ে তোলা সভ্যতাকে ধ্বংসের মুখ থেকে তুলে আনতে বিশ্বের কোটি কোটি জনতা আজ জেগে উঠেছে। সবাইকে এক কাতারে দাঁড়াতে হবে, ঐক্যের নতুন সংজ্ঞা তৈরি করতে হবে। উপরে ফেলতে হবে আগ্রাসন ও দাসত্বের কালো থাবা। বর্বরতার দংশন থেকে সভ্যতাকে বাঁচাতে হবে। মানবিক বিপ্লবের মাধ্যমে শান্তির স্তম্ভকে মজবুত করতে হবে।

জাতিসংঘ

(সংকেত: ভূমিকা; জাতিসংঘের ইতিহাস; প্রশাসনিক ব্যবস্থা; শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের ভূমিকা; জাতিসংঘের সাফল্য; জাতিসংঘের ব্যর্থতা; পরামর্শ/সুপারিশ; জাতিসংঘে বাংলাদেশ; উপসংহার।)
ভূমিকাঃ বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্ব উন্নয়নের কথা বললেই প্রথমেই যে সংস্থার নাম আসে তা হলো জাতিসংঘ। প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে এ সংস্থাটি বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছে। বলা চলে এই সংস্থাটি বর্তমানে বিশ্বশান্তির ধারক ও বাহক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সীমাবদ্ধতা ও বিতর্ক সত্ত্বেও জাতিসংঘ বিভিন্ন রাষ্ট্রে উন্নয়ন ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করে চলেছে।
জাতিসংঘের ইতিহাসঃ ১৯১৯ সালে সর্বপ্রথম বিশ্বের জাতিসমূহকে একত্রিত করে ‘লীগ অব ন্যাশনস’ গঠন করা হয়। বিশ্বশান্তি রক্ষায় ব্যর্থতার কারণে ‘লীগ অব ন্যাশনস’ বিশ্ববাসীর আস্থা অর্জন করতে পারেনি। পরবর্তীতে ১৯৩৯ সালে ২য় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে লীগ অব ন্যাশনস বিলুপ্ত হয়ে যায়। ২য় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা এবং অভূতপূর্ব ক্ষয়ক্ষতি দেখে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ নতুন করে একটি বিশ্ব সংস্থা গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এর ফলে ১৯৪১ সালে সর্বপ্রথম জাতিসংঘ গঠন সংক্রান্ত লন্ডন ঘোষণা স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৪৩ সালে ইরানের রাজধানী তেহরানে জাতিসংঘ গঠনের উদ্দেশ্যে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। অবশেষে ১৯৪৫ সালের ২ জুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন ডি রুজভেল্ট জাতিসংঘ সনদ স্বাক্ষর করেন। এর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিল ৫১টি দেশ। এরপর ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ সনদ কার্যকরের মাধ্যমে জাতিসংঘের জন্ম হয়। বর্তমানে জাতিসংঘের সদস্য সংখ্যা ১৯৩টি এবং সর্বশেষ সদস্য দেশ দক্ষিণ সুদান। জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা ৬টি। যথা ইংরেজি, ফরাসি, চীনা, রুশ স্প্যানিশ ও আরবি।
প্রশাসনিক ব্যবস্থাঃ জাতিসংঘ বিশ্বশান্তি রক্ষা এবং বিশ্বের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য ৬টি অঙ্গসংগঠনের মাধ্যমে এর কার্য সম্পাদন করে থাকে। এগুলো হলো- ক) সাধারণ পরিষদ খ) নিরাপত্তা পরিষদ গ) অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ ঘ) অছি পরিষদ ঙ) আন্তর্জাতিক আদালত চ) সচিবালয়।
ক) সাধারণ পরিষদঃ জাতিসংঘের আলাপ-আলোচনার মূলসভা হলো সাধারণ পরিষদ। একজন সভাপতি এবং ২১ জন সহ-সভাপতির অধীনে সাধারণ পরিষদ পরিচালিত হয়। সাধারণ পরিষদের সভাপতি এক বছরের জন্য নির্বাচিত হন। পরিষদের নিয়মিত বার্ষিক অধিবেশন সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় মঙ্গলবার শুরু হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
খ) নিরাপত্তা পরিষদঃ জাতিসংঘের সবচেয়ে কার্যকরী সংগঠন হচ্ছে নিরাপত্তা পরিষদ। এটিই মূলত বিশ্বশান্তি রক্ষার ক্ষেত্রে প্রধান কর্তা হিসেবে ভূমিকা পালন করে। এর সদস্য সংখ্যা ১৫টি। এর মধ্যে ৫টি সদস্যদেশ স্থায়ী সদস্য এবং তাদের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। এরা হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া এবং চীন। বাকী দশটি সদস্য দেশ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আনুপাতিক হারে ২ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়।
গ) অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদঃ জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ জাতিসংঘ পরিবার নামে পরিচিত। ৫৪টি রাষ্ট্র এর সদস্য। এ পরিষদের সদস্যরা ৩ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়। বিশ্বের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির জন্য এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
ঘ) আন্তর্জাতিক আদালতঃ জাতিসংঘের সদস্য দেশসমূহের মধ্যে বিদ্যমান বিবাদের সমাধানের উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি নেদারল্যান্ডের রাজধানী হেগে অবস্থিত। ৯ বছরের জন্য নির্বাচিত ১৫ জন বিচারক নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালত গঠিত হয়। এর সভাপতি ৩ বছরের জন্য নির্বাচিত হন।
ঙ) অছি পরিষদঃ অছি পরিষদের কাজ হলো উপনিবেশের অধীন রাষ্ট্রগুলোকে স্বাধীনতা অর্জনে সহযোগিতা করা এবং তার অভিভাবক হিসেবে ভূমিকা রাখা। ১৯৯৪ সালে সর্বশেষ পালাউ এর ক্ষেত্রে অছি হিসেবে কাজ করার পর এ পরিষদের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়।
চ) সেক্রেটারিয়েট/সচিবালয়ঃ জাতিসংঘের প্রশাসন সংক্রান্ত কার্যক্রম সেক্রেটারিয়েট সম্পন্ন করে। এর প্রধানকে বলা হয় মহাসচিব। তিনি ৫ বছরের জন্য নির্বাচিত হন। নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশের ভিত্তিতে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে মহাসচিব নির্বাচিত হয়। জাতিসংঘের প্রথম মহাসচিব ছিলেন নরওয়ের নাগরিক ট্রাইগভে লাই এবং বর্তমান মহাসচিব দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিক বান কি মুন। তিনি জাতিসংঘের ৮ম মহাসচিব। তিনি ছাড়াও মিয়ানমারের উথান্ট এশিয়ার প্রথম ব্যক্তি হিসেবে মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন।
শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের ভূমিকাঃ জাতিসংঘ গঠনের মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্বশান্তি রক্ষা করা এবং বিশ্বের দেশগুলোকে কাক্সিক্ষত উন্নতি অর্জনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করা। জাতিসংঘ যে যে উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত তা হলো-
* বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষা করা।
* জাতিসমূহের মাঝে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা ও বজায় রাখা।
* দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন।
* জাতিসমূহের লক্ষ্য অর্জনের ফোরাম হিসেবে ভূমিকা রাখা। নিরাপত্তা পরিষদ জাতিসংঘ সনদের ২৪নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত। শান্তি রক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় জাতিসংঘ কতগুলো মূলনীতি মেনে চলে। যথা-
* বিশ্বের কোথাও উত্তেজনা দেখা দিলে এবং সংঘর্ষের সৃষ্টি হলে শান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে এটি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
* জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট পক্ষের সম্মতি থাকা আবশ্যক।
* জাতিসংঘ বিবাদমান পক্ষের মধ্যে যতদূর সম্ভব নিরপেক্ষতা অবলম্বন করবে।
জাতিসংঘের সাফল্যঃ জাতিসংঘ বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হলেও এর সফলতার হার সবক্ষেত্রে সমান নয়। এটি কোথাও সফল হয়েছে আর কোথাও ব্যর্থ হয়েছে। নিচে জাতিসংঘের সফলতাগুলো পর্যায়ক্রমে তুলে ধরা হলো-
বিরোধ নিষ্পত্তিঃ জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আদালত বিশ্বের যেকোনো স্থানের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সমঝোতামূলক পথ অবলম্বন বা বিচার ও মীমাংসার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করে থাকে।
পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধঃ পরমাণু অস্ত্র বর্তমান বিশ্বের স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। পরমাণু অস্ত্রের বিস্তার রোধ করার উদ্দেশ্যে জাতিসংঘ ৯০টি দেশে পারমানবিক চুল্লি বন্ধ করে দিয়েছে। এগুলোর উপর নজরদারিও বৃদ্ধি করেছে। ফলে পরমাণু অস্ত্রের বিস্তার রোধ অনেকাংশেই সফল হয়েছে।
বর্ণবৈষম্যের অবসানঃ বর্ণবাদী প্রথা বিশ্বের শান্তি এবং স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ। জাতিসংঘ বর্ণবৈষম্যকে মানবতা বিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
মানবাধিকার উন্নয়নঃ বিশ্ব মানবাধিকারের পূর্ণ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে জাতিসংঘ সদা সচেষ্ট। এজন্য ১৯৪৮ সালের সর্বজনীন মানবাধিকারের সনদ গ্রহণ করেছে জাতিসংঘ। ইতোমধ্যে ৮০টি দেশকে মানবাধিকার বাস্তবায়নের জন্য চুক্তিতে আবদ্ধ করতে সফল হয়েছে সংস্থাটি।
পরিবেশ সংরক্ষণঃ পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য ১৯৯৫ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত ধরিত্রী সম্মেলনের আয়োজন করে জাতিসংঘ। এছাড়া জোহানেসবার্গে অনুষ্ঠিত বিশ্ব টেকসই উন্নয়নে পরিবেশের উপর জোর প্রদান করে। এটি জলবায়ু ও পরিবেশের বিরূপ প্রভাবাধীনে থাকা দেশগুলোর জন্য সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেছে।
জাতিসংঘের ব্যর্থতাঃ জাতিসংঘের সফলতার পাশাপাশি ব্যর্থতাও কম নয়। এটি বিশ্বশান্তি রক্ষার অনেক ক্ষেত্রেই কাক্সিক্ষত ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। এর ব্যর্থতাসমূহ হলো-
মধ্যপ্রাচ্য সমস্যাঃ জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো মধঘ্যপ্রাচ্য সমস্যার নিষ্পত্তি করতে না পারা। এখানে জাতিসংঘ নিপীড়িত রাষ্ট্র ফিলিস্তিনের পক্ষে না থেকে ইসরাইলের আগ্রাসনে নীরব ভূমিকা পালন করেছে।
জীবাণু অস্ত্র বিলোপঃ মানবজীবনের জন্য ভয়াবহতম এবং ধ্বংসাত্মক জীবাণু অস্ত্রের বিলোপ সাধনে জাতিসংঘের ভূমিকা আশানুরূপ নয়। এখনও বিশ্বের অনেক দেশের কাছে জীবাণু অস্ত্র রয়ে গেছে।
পশ্চিমাদের লেজুরবৃত্তিঃ বিশ্বের সবার জন্য সমান ভূমিকা পালনের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হলেও জাতিসংঘ নিজের নিরপেক্ষতা ও সার্বজনীনতা প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে। দেখা যায় এটি পশ্চিমাদের স্বার্থোদ্ধারের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।
পরামর্শ/সুপারিশঃ জাতিসংঘকে আরো কার্যকর ও বিশ্বশান্তি রক্ষায় সক্ষম স্বনির্ভর প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে-
- নিরাপত্তা পরিষদকে সম্প্রসারণ করে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। যেমন- আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে কোনো স্থায়ী সদস্য দেশ নেই। এসব ক্ষেত্রে উক্ত অঞ্চল থেকে স্থায়ী প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে হবে।
- ভেটো ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। এ জন্য ক্ষেত্র বিশেষে অচলাবস্থা নিরসনে মহাসচিবের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা প্রদান করতে হবে।
- মহাসচিবকে যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান করতে হবে।
- জাতিসংঘকে এর কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চালানোর জন্য চাঁদার ব্যাপারে আরো কঠোর হতে হবে।
- জাতিসংঘ এর সনদ অনুযায়ী কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। এজন্য জাতিসংঘ সনদের সংস্কার করতে হবে।
জাতিসংঘে বাংলাদেশঃ বাংলাদেশ এর জন্মলগ্ন থেকেই জাতিসংঘের সদস্য হওয়ার জন্য জোর চেষ্টা চালায়। এজন্য ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করা হলে চীন ভেটো দেয় ও বিরোধীতা করে। অবশেষে ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। জাতিসংঘে বাংলাদেশের পক্ষে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলায় বক্তৃতা করে বিশ্বে অনন্য নজির স্থাপন করেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। মিসেস সালমা খান CEDAW-এর কার্যকরি পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ ২য় স্থান অধিকার করেছে। বাংলাদেশি সেনারা তাদের সৎ সাহস ও যোগ্য নেতৃত্বের বলে সারাবিশ্বে সুনাম অর্জন করেছে। এ মহান কর্তব্য পালন করতে গিয়ে বাংলাদেশের ৮০ জন শান্তিরক্ষী শহিদ হয়েছেন। বাংলাদেশের উন্নয়নে জাতিসংঘ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জাতিসংঘের ভূমিকা অপরিসীম। এছাড়াও এদেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামোগত উন্নয়নে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে সাহায্য করে যাচ্ছে।
উপসংহারঃ বিশ্বশান্তি রক্ষা ও বিশ্ব উন্নয়নের জন্য জাতিসংঘ একটি অবিস্মরণীয় নাম। এর অনেক ব্যর্থতা থাকলেও এটি বিশ্বের স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং বিশ্বকে কয়েকটি সম্ভাব্য যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করেছে। এর ব্যর্থতার কারণগুলো অনুসন্ধান করে সংস্কার করতে পারলে তা পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে আশা করা যায়।

বিশ্বায়ন

(সংকেত: ভূমিকা; বিশ্বায়নের সংজ্ঞা; বিশ্বায়নের উৎপত্তি; বিশ্বায়নের উদ্দেশ্য; বিশ্বায়নের বৈশিষ্ট্য; বিশ্বায়নের কারণ; বিশ্বায়নের সুফল; বিশ্বায়নের কুফল; আমাদের করণীয়; উপসংহার।)
ভূমিকাঃ বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত একটি বিষয় হচ্ছে বিশ্বায়ন। যার মাধ্যমে বিশ্ববাসী তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে নিজেদের নাগালের মধ্যে নিয়ে এসেছে। যার ফলে জাতি-রাষ্ট্রের ধারণাটি উঠে গিয়ে সমগ্র বিশ্ব একটি গ্রামে পরিণত হয়েছে। এ সম্পর্কে পল হারস্ট ও গ্রাহাম থমসন বলেন, 'Globalization has become a fashionable concept in the social sciences.'
বিশ্বায়নের সংজ্ঞাঃ ‘বিশ্বায়নের’ ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে Globalization যা Globe শব্দ থেকে এসেছে। সাধারণভাবে বলা যায় বিশ্বায়ন হলো একটি প্রক্রিয়া, যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিশ্ববাসীর মাঝে সমন্বয় সাধন হয়ে থাকে অথবা বিশ্বকে একীভূত করা হয়। বিশ্বায়নের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে Red wood বলেন, “Globalization is the creation of single world market”. আবার মার্টিন আলব্রো বলেন- ‘বিশ্বায়ন হলো সামগ্রিক কমিউনিটির মধ্যে সমস্ত মানুষকে নিয়ে আসার একটি প্রক্রিয়া।’ সুতরাং বলা যায় বিশ্বায়ন হচ্ছে সীমারেখাহীন বিশ্বব্যবস্থা, যার দ্বারা বিশ্বে আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক তৈরি হয়ে থাকে।
বিশ্বায়নের উৎপত্তিঃ ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর বিশ্বায়ন শব্দটির প্রচলন ঘটে। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, গত শতাব্দীর ৬০-এর দশকের শেষ দিকে ‘ক্লাব অব রোম’ অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপর পাশ্চাত্য মডেলের সীমাহীন প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে যে ঘোষণা দেয় সেখান থেকেই মূলত বিশ্বায়নের সূত্রপাত হয়। যার মাধ্যমে আজ বিশ্বে সৃষ্টি হয়েছে একই বিশ্বসীমানা ও একই বিশ্ব সম্প্রদায়।
বিশ্বায়নের উদ্দেশ্যঃ বিশ্বায়ন ধারণার মূল উদ্দেশ্য হলো বাজার সম্পর্কিত আইন প্রণয়ন করা, সরকারি ব্যয় ও নিয়ন্ত্রণ হ্রাস এবং সরকারি সম্পত্তি ধারণার বিলোপ সাধন করে তা বেসরকারি আওতায় নিয়ে আসা। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বায়নের লক্ষ্য হলো স্নায়ুযুদ্ধের অবসান, পূর্ব-ইউরোপ ও পূর্বতন সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্র ও নিয়ন্ত্রিত অর্থ ব্যবস্থার উপর গণতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতির আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।
বিশ্বায়নের বৈশিষ্ট্যঃ বর্তমান বিশ্বে বিশ্বায়ন প্রচন্ড গতিতে এগিয়ে চলছে। এর কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন-
- বিশ্বায়ন একটি জটিল ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া।
- প্রযুক্তির দ্বারা বিশ্বায়ন নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে।
- বিশ্বায়ন একটি পরিবর্তনশীল বিষয়।
- বিশ্বায়ন নতুন কৌশলে নব্য উপনিবেশবাদের জন্ম দিয়েছে।
- বিশ্বায়ন সমস্ত বিশ্বের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে বিশ্বকে হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে।
- বিশ্বায়ন সাম্রাজ্যবাদের ধারক ও বাহক হিসেবে কাজ করে।
- বিশ্বায়ন উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
- একে অপরকে সহযোগিতার জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়ে তুলেছে অর্থাৎ FU, AU, ASEAN বিশ্বায়নের সৃষ্টি।
- বিশ্বায়নের চলার যে গতি তাতে সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায় না।
বিশ্বায়নের কারণঃ বিশ্বায়নের জন্য কোনো একক কারণ দায়ী নয় বরং এর পেছনে রয়েছে এক বা একাধিক কারণ। সেগুলো হলো -
তথ্য ও প্রযুক্তির বিকাশঃ বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার প্রধানতম কারণ হচ্ছে তথ্য ও প্রযুক্তির অবাধ বিকাশ। আর এ বিকাশের ধারাবাহিকতায় ঔপনিবেশিক আমল হতে প্রথম টেলিগ্রাফ লাইন স্থাপন করা হয়। এরপর রেডিও টেলিভিশন, কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট প্রভৃতির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী যোগাযোগের একটা সেতুবন্ধন তৈরি করা হয়।
সমাজতন্ত্রের পতনঃ নব্বই-এর দশকে সমাজতন্ত্রের পতন সংঘটিত হলে তার জায়গাটি দখল করে মূলত সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। আর এই শক্তির দ্বারাই পরবর্তীতে বিশ্বায়নের পথ প্রশস্ত হয়।
গণতন্ত্রের প্রসারঃ একটা সময় রাজতন্ত্রের জোয়ারের ফলে বিশ্বায়নের ধারণাটিই স্পষ্ট ছিল না। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে গণতন্ত্রের অবাধ প্রসারের ফলে বিশ্বায়নের গতিও কিছুটা বৃদ্ধি পায়।
পরিবর্তনশীল সমাজব্যবস্থাঃ পৃথিবীতে স্থায়ী বলতে কিছু নেই। এই সাধারণ নিয়মের সাথে একাত্বতা ঘোষণা করে বিশ্বের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। ঠিক একই সাথে বিশ্বায়নের বিকাশও ত্বরান্বিত হচ্ছে।
বহুজাতিক সংস্থাঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিশ্বে বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থা জন্ম নিয়েছে। যা বিভিন্ন দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একটা যোগসূত্র স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। আর এ সমস্ত বহুজাতিক সংস্থার মাধ্যমে বিশ্বায়নের পথ সহজ হয়েছে।
তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়ন স্পৃহা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবস্থা খারাপ অবস্থায় পতিত হয়। তাই উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের চলমান উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য বিশ্বায়নকে স্বাগত জানায়।
বিশ্বায়নের সুফলঃ বিশ্বায়ন একটি আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার বেশ কিছু সুফল রয়েছে যা নিম্মরূপ-
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উন্নয়নঃ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বায়নের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। বিশ্বায়নের ফলে ইউরোপের দেশসমূহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠন করেছে। এছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সহযোগিতামূলক জোট গড়ার মাধ্যমে বিশ্বে সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে।
মুক্তবাজার অর্থনীতির বিকাশঃ বিশ্বায়নের ধারণার সাথে মুক্তবাজার অর্থনীতির সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। মুক্তবাজার অর্থনীতির ফলস্বরূপ বিশ্ববাজার ব্যবস্থার দ্বার সকলের কাছে উম্মোচিত হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য এখন মানুষের হাতের মুঠোয় এসেছে ই-কমার্স এর মাধ্যমে। এ ব্যবস্থায় বিশ্বের এক প্রান্তে বসে আরেক প্রান্তে ব্যবসায়ের কার্যাদি সম্পন্ন হচ্ছে।
বৃহদায়তন কর্মকান্ডের প্রসারঃ বৃহদায়তন বাজার ব্যবস্থার যে বিস্তার লক্ষ্য করা যায় তাতে বৃহৎ উৎপাদন ও বিপণন সহজসাধ্য হয়েছে। আর এটি মূলত বিশ্বায়নের সুফল। এতে একদিকে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাচ্ছে অন্যদিকে মুনাফার পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জ্ঞান ও দক্ষতার সমন্বয়: বিশ্বায়নের ফলে যেমন বিশ্ব খুব কাছাকাছি এসে কাজ করছে ঠিক তেমনি উন্নত দেশসমূহের জ্ঞান, দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা অন্যান্য দেশ সহজে কাজে লাগিয়ে নিজেদের সমৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। যার দরুণ বিশ্বে জ্ঞান ও দক্ষতার সমন্বয় সাধিত হচ্ছে।
যোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তির উন্নতিঃ বিশ্বায়নের ফলে বিশ্বে যোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। এ কথা সহজে বলা যায় যে, অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে যোগাযোগ অধিক সহজতর। আবার তথ্যপ্রযুক্তিতে যে যতো উন্নত সে ততো উন্নয়ন করতে সক্ষম হচ্ছে।

বিশ্বায়নের কুফলঃ বিশ্বায়নের সুফলের পাশাপাশি এর কিছু কুফলও লক্ষ্য করা যায়। সেগুলো হলো-
অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধিঃ এক দেশের সাথে আরেক দেশের যে অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি হয়েছে তা মূলত বিশ্বায়নেরই ফল হিসেবে বিবেচিত হয়।
অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টিঃ বিশ্বায়নের ফলে যে দেশগুলো শিল্পে অনুন্নত সে দেশগুলো প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে শিল্প কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছে। ফলে বেকারত্বের হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
শিক্ষা ব্যবস্থার বিপর্যয়ঃ উন্নত বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থা অধিক উন্নত বিধায় অনুন্নত দেশ উপকৃত হওয়ার আশায় একদিকে যেমন প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে, অন্যদিকে তাদের নিজস্ব শিক্ষা ব্যবস্থাও ধ্বংস হচ্ছে।
গোপনীয়তা রক্ষা কঠিনঃ ইন্টারনেট, ই-মেইল, ফ্যাক্স ইত্যাদি ব্যবহারের মাধ্যমে অনুন্নত দেশগুলোর গোপনীয় দলিল, সংবাদ ও তথ্য অতি তাড়াতাড়ি বিদেশি প্রতিপক্ষের হস্তগত হচ্ছে।
সাংস্কৃতিক সংকটঃ বিশ্বায়নের দ্বারা সংস্কৃতি আজ চরমভাবে বিপর্যস্ত। ধনী দেশসমূহের অপসংস্কৃতির প্রভাবে গরীব বা অনুন্নত দেশের সংস্কৃতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
আমাদের করণীয়ঃ আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বিশ্বায়নের এই তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে কতগুলো পদক্ষেপ নিতে হবে। যথা-
- তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে উৎসাহমূলক কর্মকান্ড ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
- জনশক্তির কর্মদক্ষতা বাড়ানোর জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখতে হবে।
- প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে শিক্ষিত বেকারদের কাজে লাগাতে হবে।
- সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি প্রতিরোধে আইনের শাসনের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
- দারিদ্র্য নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
উপসংহারঃ বিশ্বকে একই আয়নায় দেখার জন্য বিশ্বায়নের সৃষ্টি। বিশ্বায়নের কিছু নেতিবাচক প্রভাব বা কুফল থাকলেও এটি তার আপন গতিতে চলমান। তাই এর নেতিবাচক দিকগুলোর প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রেখে ইতিবাচক দিকগুলোর সুফল অর্জন করাই আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর করণীয় হওয়া উচিত।